দুঃখের স্বরূপ : ভারতীয় দর্শনের আঙ্গিকে
Keywords:
- দুঃখ,
- সুখ,
- মুক্তি,
- জন্ম,
- কর্ম,
- শরীর
Abstract
সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জীবনেই ‘ব্যাথা’, ‘বেদনা’, ‘যন্ত্রণা’, ‘কষ্ট’, ‘পীড়া’- এই শব্দগুলি দুঃখবাচক শব্দ বলেই পরিচিত। মনেরই কেবল ‘দুঃখ’ হয়। কি ভাবে দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? ভারতীয় দর্শনে চার্বাক ব্যাতীত সকল ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায় দুঃখের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। দুঃখকে কি করে জানা যাবে? কোন একটি বিশেষ পশুকে কে (ধরা যাক গরুকে) নিশ্চয়তার সঙ্গে সবাই জানতে পারে বা প্রত্যক্ষ করতে পারে। ‘অহং দুঃখী’– এই ভাবে নিজের দুঃখের মানস প্রত্যক্ষ হয়। কোন ব্যক্তিকে ‘কাঁদতে’ বা ‘উফ’ বলতে শুনলে বা কষ্ট জ্ঞাপক আওয়াজ বের করলে– মুখমালিন্যাদি হেতুর দ্বারা অন্যের দুঃখের অনুমান করা হয়। মনের দ্বারা শুধুমাত্র নিজের দুঃখকেই প্রত্যক্ষ করা যায়।
ভোগবাদী ও ত্যাগবাদী কে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শনিকগন দুই ভাগে বিভক্ত। ত্যাগবাদীদের মতে জগৎ দুঃখময় মরুভূমি, এখানে প্রকৃত সুখ বলে কিছু নেই যা আছে, তা সুখের আভাস মাত্র। ভগবাদি চার্বাকরা বলেন- “যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ”, অর্থাৎ যতদিন বাঁচবে, সুখে বাঁচবে, পরয়োজনে ঋণ করেও ঘি খাবে। বুদ্ধদেবের মনে হয়েছিল –‘সুখের দ্বারা সুখ প্রাপ্য নয়, দুঃখের মধ্য দিয়েই সুখের আগমন ঘটে।জৈনরা বলেন, জীব স্বভাবত দুঃখ চাই না, সুখ অর্জন করতে গিয়ে অজ্ঞান বশতঃ দুঃখ অর্জন করে। মানুষের নিজকৃত কর্মের ফসল দুঃখ। ন্যায় মতে সুখ,দুঃখ, প্রযত্ন প্রভৃতি গুন আত্মার মধ্যে আবির্ভুত হয়। তারা দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তিকেই মুলত অপবর্গ বলেন। সাংখ্যরা বলেন, এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মণ্ডে সকল বস্তুর অস্তিত্বকে সন্দেহ করা যেতে পারে, কিন্তু দুঃখের অস্তিত্বকে কোনভাবেই সন্দেহ করা যায় না। কারণ দুঃখ সর্বজন সম্মতিসিদ্ধ বলেই তাকে অস্বীকার করা যায় না। দুঃখের উচ্ছেদই হচ্ছে কৈবল্য। মীমাংসকদের মতে শরীর হল আত্মার সুখ-দুঃখ ভোগের আধার।নিষিদ্ধ ও কাম্য কর্মের অনুষ্ঠান না করায় উৎপাদ্য ধর্ম-অধর্মের অনুপপত্তি হয় এবং জীব দেহের বিনাশ হয় এবং পুণর্জন্মের সম্ভাবনা না থাকায় জীব দুঃখ মুক্ত হয়ে থাকেন।উপসংহারে এসে বলা যায় সুখ-দুঃখ নিয়েই জীবের সংসার। সংসারে নিরবচ্ছিন্ন সুখ কোথাও নেই, যেখানেই সুখ সেখানেই দুঃখ। মানুষ যদিও নিজের প্রচেষ্টায় সকল প্রকার দুঃখ দূর করতে পারলেও জরা-মৃত্য জনিত দুঃখ কখনই দূর করতে পারেনা। যতদিন শরীর থাকবে ততদিন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, জরামরণ জনিত দুঃখ থাকবে।
Downloads
References
১. চক্রবর্তী, অরিন্দম, মননের মধু, গা ঙ চি ল, অগস্ট, ২০০৮, পৃ. ১৬০
২. শ্রীকেশব মিশ্রবিরচিতা, তর্কভাষা, বঙ্গানুবাদ–বিবৃতিসহিতা দ্বিতিয় খণ্ড – শ্রীগঙ্গাধর কর ন্যায়াচার্য
৩. মণ্ডল, প্রদ্যোতকুমার, ভারতীয় দর্শন, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, মার্চ, ১৯৯৯, পৃ. ৬৫
৪. শাস্ত্রী, দক্ষিণারঞ্জন, চার্বাক দর্শন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, বৈশাখ, ১৩৬৬, পৃ. ১১১
৫. বসু, রণদীপম, চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন (জৈন ও বৌদ্ধ), রোদেলা প্রকাশনী, একুশে বইমেলা, ২০১৭, পৃ. ১৪১
৬. গুপ্ত, মিহির, ধম্মপদ- সম্পাদনা– রণব্রত সেন, হরফ প্রকাশনী, শ্রাবণ, ১৩৮১, পৃ. ১০০
৭. বসু, রণদীপম, চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন (জৈন ও বৌদ্ধ), রোদেলা প্রকাশনী, একুশে বইমেলা, ২০১৭, পৃ. ১৬৬
৮. পাল, ডঃ বিপদ্ভঞ্জন, ভারতীয় দর্শন, সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, সেপ্টেম্বর, ২০১৪, পৃ. ৮৬
৯. পূর্ববৎ, পৃ. ৮৯
১০. তর্কবাগীশ, ৺ফণীভূষণ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, নভেম্বর, ১৯৭৮, পৃ. ৬
১১. পূর্ববৎ, পৃ. ৬
১২. পাল, ডঃ বিপদ্ভঞ্জন, ভারতীয় দর্শন, সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, সেপ্টেম্বর, ২০১৪, পৃ. ৩০০
১৩. গোস্বামী, শ্রীনারায়ন চন্দ্র, ঈশ্বরকৃষ্ণকৃতা সাংখ্যকারিকা শ্রীমদবাচস্পতিমিশ্রবিরচিতা সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদী, সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, ১৪০৬, পৃ. ১০
১৪. পূর্ববৎ, পৃ. ১৩
১৫. ভট্টাচার্য, সুখময়, পূর্বমীমাংসা দর্শন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, এপ্রিল, ১৯৮৩, পৃ. ২০৩
১৬. বসু, রণদীপম, চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন (পূর্বমীমাংসা), রোদেলা প্রকাশনী, একুশে বইমেলা,২০১৭, পৃ. ২৩৮
১৭. ভট্টাচার্য, সুখময়, পূর্বমীমাংসা দর্শন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, এপ্রিল, ১৯৮৩, পৃ. ২০১
১৮. পূর্ববৎ, পৃ. ২০৩
১৯. মিশ্র, প্রভাত, শঙ্করের দর্শন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, ২০১৯, পৃ. ১০৯

