ভারতীয় সাহিত্যে প্রতিফলিত তৃতীয় লিঙ্গ/ Third gender reflected in Indian literature
Keywords:
- অর্জুন (বৃহন্নলা),
- অম্বা,
- শিখণ্ডী,
- তৃতীয় লিঙ্গ
Abstract
এই গবেষণা নিবন্ধে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অবস্থান, সামাজিক মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা অন্বেষণের একটি প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। বিশেষত মহাভারত, পুরাণ ও রামায়ণ-এর বিভিন্ন আখ্যানের আলোকে তৃতীয় লিঙ্গের অস্তিত্ব কেবল জৈবিক বা সামাজিক বাস্তবতা হিসেবেই নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত এক স্বীকৃত সত্তা হিসেবে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে— তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মহাভারতে তৃতীয় লিঙ্গ অর্জুন (বৃহন্নলা) মহাভারত (৪/১০/৮) অনুসারে, বারো বছর বনবাস ও এক বছর অজ্ঞাতবাসকালে পাণ্ডবরা বিরাট রাজার আশ্রয়ে অবস্থান করেন। এই সময় অর্জুন নিজের অস্ত্রশস্ত্র গোপনে সংরক্ষণ করে বৃহন্নলা নামে নপুংসক পরিচয়ে বিরাটনগরে প্রবেশ করেন এবং রাজকন্যা উত্তরার নৃত্যশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। বৃহন্নলা পরিচয়টি কেবল আত্মগোপনের কৌশল নয়, বরং তৃতীয় লিঙ্গের সামাজিক স্বীকৃত অবস্থানকেও নির্দেশ করে।
অম্বা ও শিখণ্ডী - কাশীরাজ হিরণ্যবর্মার কন্যা অম্বা, তাঁর দুই বোন অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে ভীষ্ম কর্তৃক স্বয়ংবর সভা থেকে অপহৃত হন। কিন্তু অম্বা জানান, তিনি শাল্বরাজ শম্বুকে পতিত্বে বরণ করেছেন (মহাভারত ১/৯৬/৫১)। পরবর্তীকালে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অম্বা ভীষ্মের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণের সংকল্প করেন। শিবের তপস্যার ফলে তিনি বর লাভ করেন— দ্রুপদের ঘরে জন্ম নিয়ে পরে পুরুষে রূপান্তরিত হবেন এবং ভীষ্মকে বধ করবেন। সেই অনুযায়ী অম্বা দ্রুপদের কন্যা হিসেবে জন্ম নিয়ে শিখণ্ডীতে রূপান্তরিত হন।
শিখণ্ডীর জন্ম ও লিঙ্গরূপান্তর সম্পর্কিত একাধিক বর্ণনা মহাভারত-এ পাওয়া যায় (১/৬/৮৭; ৫/১৮৮)। দ্রুপদ রাজা কন্যাকে পুত্ররূপে প্রতিপালন করেন এবং সমাজে তাঁকে পুরুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শিখণ্ডীই ভীষ্মবধের প্রধান সহায়ক হন— যা তৃতীয় লিঙ্গের যোদ্ধা-সত্তাকে স্বীকৃতি দেয়।
রামায়ণে তৃতীয় লিঙ্গ : ইল উপাখ্যান আদি কবি বাল্মীকির রামায়ণ-এর উত্তরকাণ্ডের শততম অধ্যায়ে বর্ণিত ইল উপাখ্যান তৃতীয় লিঙ্গ বিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক নিদর্শন।
বাহ্লীকদেশের কর্দম রাজা ছিলেন এক ধর্মপরায়ণ ও মহাবীর রাজা। একদিন বসন্তকালে মৃগয়ায় গিয়ে তিনি এমন এক স্থানে প্রবেশ করেন, যেখানে মহাদেব উমাদেবীর সন্তুষ্টির জন্য স্ত্রী-রূপ ধারণ করেছিলেন। সেই স্থানে প্রবেশ মাত্রই সমস্ত পুরুষ ও নপুংসক প্রাণী স্ত্রীলিঙ্গে রূপান্তরিত হয়—
“যত্র যত্র বনোদ্দেশে সত্ত্বাঃ পুরুষবাদিনঃ।
বৃক্ষাঃ পুরুষনামাস্তে সর্বে স্ত্রীজনাভবন্॥”
(রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড ১০০/১২–১৩)
এর ফলে রাজা ইল নিজেও নারীরূপ প্রাপ্ত হন এবং গভীর শোকে মহাদেবের শরণাপন্ন হন। মহাদেব পুরুষত্ব ব্যতীত অন্য বর চাইতে বললেও ইল দেবী উমার শরণ নেন। উমাদেবীর কৃপায় তিনি বর লাভ করেন— এক মাস পুরুষ ও এক মাস নারী রূপে অবস্থান করার।
“মাসং স্ত্রীত্বমুপাসিত্বা মাসং স্যাং পুরুষঃ পুনঃ।”
তবে শর্ত ছিল— যখন তিনি পুরুষ হবেন, তখন নারীত্বের স্মৃতি থাকবে না; আর নারী হলে পুরুষত্বের স্মৃতিও লুপ্ত হবে। এইভাবেই রাজা ইল পর্যায়ক্রমে এক মাস পুরুষ ও এক মাস ত্রৈলোক্যসুন্দরী নারী ইলা রূপে অবস্থান করতেন।
এই আলোচনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে তৃতীয় লিঙ্গ কোনো প্রান্তিক বা অবহেলিত সত্তা ছিল না; বরং ধর্ম, রাজনীতি, যুদ্ধ ও সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রে তার সুস্পষ্ট ও সম্মানজনক উপস্থিতি ছিল। বৃহন্নলা, শিখণ্ডী কিংবা ইল—এই চরিত্রগুলি তৃতীয় লিঙ্গের অস্তিত্বকে স্বাভাবিক ও স্বীকৃত রূপে প্রতিষ্ঠা করে, যা সমকালীন সমাজবীক্ষার জন্যও গভীর তাৎপর্য বহন করে।
Downloads
References
১. পাণিনি-৬/৩/৭৫
২. মনুসংহিতা-২/৯১/ পৃ. ১৭৫, শ্রীযুক্ত শ্যামা কান্ত বিদ্যাভূষণ সম্পা, সংস্কৃতপুস্তক ভাণ্ডার, ১৯০৬
৩. ঐ, ৯/২০৩/ পৃ. ২৭৪
৪. ঊনবিংশতিসংহিতা, পরাশর সংহিতা- ৪/২৬/ পৃ. ১৯৫, পরাশর-পঞ্চানন তর্ক রত্ন, অশোক কুমার বন্দোপাধ্যায় সম্পা, সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, ১৪০৭
৫. বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ-২/৮৭/১১, আচার্য শিবপ্রসাদ দ্বিবেদী, চৌখাম্বা সুরভারতী, ২০১৬
৬. পঞ্চতন্ত্র, বিষ্ণুশর্মা-১/৩৫০
৭. বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, প্রথম খণ্ড, ২০১৬
৮. বিদ্যাসুন্দর, রামপ্রসাদ সেন, ১৩১৩
৯. শ্রীধর্মমঙ্গল-মাণিক গাঙ্গুলী, ২৩৬, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ
১০. অমরকোষ, চন্দ্রমোহন তর্করত্ন, সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, ১৮৮৬
১১. পাণিনি, অষ্টাধ্যায়ী- (২/২/২)
১২. মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, কালিপ্রসন্ন সিংহ, তুলিকলম, দ্বিতীয়, ১৯৮৭
১৩. ঐ, (১/৯৬/৫১)
১৪. ঐ, (১/৬/৮৭)
১৫. ঐ, (৫/১৮৮)
১৬. রামায়ণ, বাল্মীকি, পঞ্চানন তর্করত্ন, তর্করত্ন, উত্তর- (১০০/১২-১৩, পৃ. ১৪৩৬), ১৪০৭
১৭. ঐ, উত্তর- (১০০/১৬-খ/ পৃ. ১৪৩৬)
১৮. ঐ, উত্তর- (১০১/৩/ পৃ. ১৪৩৭)
১৯. ঐ, উত্তর- (১০০/৫/ পৃ. ১৪৩৭)
২০. ঐ, উত্তর- (১০২/২২/ পৃ. ১৪৩৯)
২১. ঐ, উত্তর- (১০৩/২৫/ পৃ. ১৪৪১)
২২. মহাভারত, ব্যাসদেব, অনুশাসন পর্ব -১১-১২ অধ্যায় (পৃ. ৮৭৯-৮৮১)

