উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালির বর্ণ ও জাতি পরিচয়গত দ্বন্দ্ব : নানা পরিসর/ Conflicts based on Caste and Race Identity: A study basically focused on The First Half of Nineteen Century Bengal
Keywords:
- নবধা লক্ষণ,
- বাবু সংস্কৃতি,,
- নতুন বর্ণ-কাঠামো,
- পি ভি কানে,
- ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্
Abstract
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালির জাতি ও বর্ণ-কাঠামো নিয়ে নতুন করে চিন্তা শুরু হয়। অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন পুরনো শাস্ত্রের কাঠামোতেও পরিবর্তন ঘটায়। জাতি ও বর্ণ দুটি পৃথক ধারণা থেকে নির্ণিত হলেও এ সময়ে সে নিয়ে প্রবল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। জাতি ব্যবস্থা বৃত্তি অনুসারী ছিল বৃত্তির বদল জাতির পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে বর্ণ কাঠামো ছিল স্মৃতি অনুসারী। বাঙ্গীয় স্মৃতিকার রঘুনন্দনের মতে বাংলায় ব্রাহ্মণ ও শূদ্র ছাড়া কোনো জাতির অস্তিত্ব নেই। কিন্তু জাতি ব্যবস্থায় জলচল ও জল-অচলের ভেদাভেদ ছিল। উনিশ শতকের শুরুতে অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে অনেক জাতিই তুলনায় উচ্চ জাতিত্বের দাবি জানায়। ফলে শুরু হয় শাস্ত্রীয় সংঘাত। বাংলায় তখনও পর্যন্ত কর্মবাদ ছিল প্রবল। ফলে শাস্ত্রীয় আচারের জটিলতায় এই দ্বন্দ্ব ধর্ম-ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল। অন্যদিকে, উপযোগবাদী ইউরোপীয়দের চিন্তায় শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন সে সময়ে বাঙালির চিরায়ত বৃত্তি কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়। তাতেও নিজেদের প্রাধান্য ও আভিজাত্য প্রমাণ করতে কিছু জাতি মরীয়া হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিই উনিশ শতকের বাঙালিকে আধুনিক চিন্তার দিকে কিছুটা প্রগতি এনে দেয়।
মূলত ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্যদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব শাস্ত্রীয় ও লৌকিক তর্ক-বিতর্কের জন্ম দেয়। বিবিধ ব্যবস্থাপত্র ও সংবাদপত্রের আলোচনায় উঠে আসে এরকমই অনেক তথ্য। সেই তথ্যগত জটিলতার সূত্রকেই নানাভাবে এই আলোচনায় আমরা তুলে আনার চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে দিয়ে আমরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি সমকালীন চিন্তাগত এই জটিলতা বাঙালিকে কীভাবে ধাক্কা দিয়েছে এবং সেই জটিলতার সূত্র কীভাবে আধুনিক বাঙালিকে অগ্রগতি দিয়েছে। আমরা আমাদের আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রেখেছি মূলত ব্রাহ্মণদের মধ্যে জাতি-বর্ণ ঘটিত বিবাদের অংশটিকেই। যদিও সে সূত্রেও আলোচনায় এসেছে অন্যান্য জাতি পরিসরের বৃত্তান্ত।
Downloads
References
১. Kane, Pandurang Vaman; History of Dharmasastra (Ancient and Mediavel Religious and Civil Law), Vol. II, Part I., Poona: Bhandarkar Oriental Research Institute, 1941, p. 54-55
২. সান্যাল, হিতেশরঞ্জন, ‘বাংলায় ‘জাতি’র উৎপত্তি’, জাতি, বর্ণ ও বাঙালি সমাজ, বন্দ্যোপাধ্যায়, শেখর ও দাশগুপ্ত, অভিজিৎ; আই সি বি এস, নয়া উদ্যোগ, ২০২২, কলকাতা, পৃ. ২৭
রায় নীহাররঞ্জন, বাঙ্গালীর ইতিহাস, দে’জ, কলকাতা, ১৪২৯, পৃ. ৩৪৪
৩. সান্যাল হিতেশরঞ্জন, ‘বাংলায় ‘জাতি’র উৎপত্তি’, জাতি, বর্ণ ও বাঙালি সমাজ, বন্দ্যোপাধ্যায় শেখর দাশগুপ্ত অভিজিৎ, আই সি বি এস, কলকাতা : নয়া উদ্যোগ, ২০২২, পৃ. ২৯
৪. কুলীনেরা মুখ্য-গৌণ হিসেবে ও শ্রোত্রিয়রাও ‘সিদ্ধ’ ও ‘সাধ্য’-র হিসেবে দুইভাগে বিভক্ত ছিল। গৌণ-কুলীন ও সিদ্ধ শ্রোত্রিয়েরা বীরাচারি তন্ত্র-ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট ছিল।
বসু, নগেন্দ্রনাথ; বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ-বিবরণ), কলিকাতা : বিশ্বকোষ কুটীর, ১৩৩৪, পৃ. ৩৪
৪. এ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন মনে করেছেন— “সমাজ যতদিন পর্যন্ত ব্যাবসা-বাণিজ্যপ্রধান ছিল, যতদিন অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্যই ছিল সামাজিক ধনোৎপাদনের প্রধান উপায় ততদিন পর্যন্ত বর্ণস্তর হিসাবে না হউক, অন্তত রাষ্ট্রে এবং সামাজিক মর্যাদায় বণিক-ব্যাবসায়ীদের বেশ প্রতিষ্ঠাও ছিল। কিন্তু সপ্তম-অষ্টম শতক হইতে বাঙালীর সমাজ প্রধানত কৃষি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহশিল্পনির্ভর হইয়া পড়িতে আরম্ভ করে, তখন হইতেই অর্থোৎপাদক ও শ্রমিকশ্রেণীগুলি ক্রমশ সামাজিক মর্যাদাও হারাইতে আরম্ভ করে।” রায়, নীহারঞ্জন; বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, কলকাতা : দে’জ পাবলিশিং, ১৪২৯, পৃ. ৩৪৪
৫. বসু, নগেন্দ্রনাথ; বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস কায়স্থ-কাণ্ড, কলিকাতা : বিশ্বকোষ কুটীর, ১৯৩৭, পৃ. ৬
৭. প্রাচীনকাল থেকেই এরা জমির সত্ত্বও ভোগ করত।
৮. মুখোপাধ্যায়, সুবোধ কুমার; বাংলার আর্থিক ইতিহাস ঊনবিংশ শতাব্দী, কলকাতা : কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানী, ২০১০, পৃ. ২
৯. ব্রাহ্মণেরা আইনজীবী, চিকিৎসক, অধ্যাপক থেকে ভূমিজীবী ইত্যাদি নানা পেশা গ্রহণ করেছিলেন। মনে করা হয়, পাচক বৃত্তি গ্রহণের কারণ ব্রাহ্মণদের অন্ন সকল জাতিই গ্রহণ করতে পারত— এই নিয়ম পাচক ব্রাহ্মণদের সুবিধা করে দিয়েছিল। মুখোপাধ্যায়, অমিতাভ; জাতিভেদপ্রথা ও উনিশ শতকের বাঙ্গালী সমাজ, কলকাতা : কে পি বাগচী অ্যাণ্ড কোম্পানি, ১৯৮১, পৃ. ১৯
১০. বন্দ্যোপাধ্যায়, কেদারেশ্বর; দেবগণের অভিনব-ভারত-দর্শন (বর্ত্তমান-সমাজ-চিত্র), কলিকাতা : ষ্টুডেণ্টস্ লাইব্রেরী, ১৩২০, পৃ. ১৭২
১১. বল্লাল সেন কৌলীন্য ব্যবস্থা চালু করেছিলেন বলে মনে করা হলেও ঐতিহাসিকদের মতে এই ব্যবস্থা বাংলায় অনেক আগে থেকেই চালু ছিল।
১২. বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ (সংকলক ও সম্পাদক); সংবাদপত্রে সেকালের কথা, প্রথম খণ্ড ১৮১৮-১৮৩০, কলিকাতা : বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, মাঘ ১৪২৫, পৃ. ১০৮
১৩. কুলাচার্য্যরাই সেকালে কুলজিগ্রন্থগুলির রচয়িতা, সংরক্ষক ছিলেন। তাঁরা সমাজের আভিজাত্য রক্ষা করতে কোনো পরিবারের/জাতির ব্যবহারিক ত্রুটিতে তাদের জাতিভ্রষ্ট করার কথা লিপিবদ্ধ করত। অভিজাত পরিবার কখনও চাইত না তাদের জাতি নষ্ট হোক। এতে কুলাচার্য্যরা সন্ত্রাস বজায় রাখতে পারত। জন্ম-বিবাহ-মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিধানকর্তা হিসেবেও তাদের প্রাধান্য ছিল।
১৪. বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ (সংকলক ও সম্পাদক); সংবাদপত্রে সেকালের কথা, প্রথম খণ্ড ১৮১৮-১৮৩০, কলিকাতা : বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, মাঘ ১৪২৫, পৃ. ১০৮
১৫. পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৮
১৬). পূর্বোক্ত, পৃ. ১২০
১৭. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত নগেন্দ্রনাথ বসুর তথ্যকে ভিত্তি করে জানিয়েছেন— “কোন্ এক মুসলমান সিপাহী ব্রাহ্মণকে ঘুসি মেরেছে, তাতে তার জাত নষ্ট হয়ে গেল। মুসলমানের খানার ঘ্রাণ কোন ব্রাহ্মণের নাকে ঢুকলো তো অমনি ‘ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম্’ বলে তার জাতিপাত হল।”
দত্ত, ভূপেন্দ্রনাথ; বাঙ্গালার ইতিহাস, কলিকাতা : নবভারত পাবলিশার্স, ফাল্গুন ১৩৮৩, পৃ. ১৫৭
কুলজী গ্রন্থগুলোয় এর আরো প্রমাণ আছে। ‘দোষমালা’ নামক গ্রন্থে আছে শ্রীনাথ চট্টোপাধ্যায় নামক এক কুলীনের অবিবাহিত মেয়েকে হাঁসাই খাঁ নমক এক খানাদার ধর্ষণ করলে শ্রীনাথকে জাতিচ্যুত করা হয়।
পূততুণ্ড শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্র, কৌলীন্যপ্রথা, বরিশাল : বরিশাল—আদর্শ যন্ত্র, ১৩১৪, পৃ. ৪২
১৮. চৈতন্যজন্মের মোটামুটি পঞ্চাশ বছর আগে এই ব্যবস্থা চালু করেন দেবীবর।
বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র; কৃত্তিবাস পণ্ডিত, সাহিত্য-পরিষদ্-পত্রিকা, চতুর্থ খণ্ড, দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৩০৪ সন, পৃ. ১৩৩
১৯. সরকার, প্রফুল্লকুমার; ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু, কলিকাতা : আনন্দ-হিন্দুস্থান প্রকাশনী, অক্টোবর ১৯৪৫, পৃ. ৩৩
২০. বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র; কৃত্তিবাস পণ্ডিত, সাহিত্য-পরিষদ্-পত্রিকা, চতুর্থ খণ্ড, দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৩০৪ সন, পৃ. ১৩৩
২১. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত জাতিপাতের কারণটি ইঙ্গিতে বুঝিয়েছেন— “মুসলমান যুগে ব্রাহ্মণেরা মুসলমান রাজাদের অর্থ নিয়ে লোকের জাতিপাত করতো।”
দত্ত, ভূপেন্দ্রনাথ; বাঙ্গালার ইতিহাস, কলিকাতা : নবভারত পাবলিশার্স, ১৩৮৩, পৃ. ১৫৭
২২. সমাচার দর্পণে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত একটি সংবাদে দেখতে পাই বালি গ্রামের গোবিন্দচন্দ্র নামক এক কুলীনের একশো স্ত্রী ছিল।
বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ; সংবাদপত্রে সেকালের কথা, দ্বিতীয় খণ্ড, কলকাতা : বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, ১৪২৫, পৃ. ২৫৪
২৩. পূর্বোক্ত, পৃ. ২৪৩
২৪. পূর্বোক্ত, পৃ. ২৪৪
২৫. পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫০
২৬. পূর্বোক্ত
২৭. পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫৪
২৮. পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫৬

