বিভূতিভূষণের গল্পে ছোটোনাগপুরের ভূগোল : মানচিত্রবোধ ও অভিজ্ঞতার সূত্র

Authors

  • Sourav Das গবেষক, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় Author

Keywords:

  • ছোটোনাগপুর,
  • বিভূতিভূষণের মানস জগত,
  • ছোটোনাগপুরের গল্প,
  • জৈবিক ও মানসিক যোগ

Abstract

বিভূতিভূষণের ভ্রমণকথা ‘বনে পাহাড়ে’ (১৯৪৫) এবং দিনলিপি ‘হে অরণ্য কথা কও’ (১৯৪৮) পড়লে দেখা যায় তিনি তাঁর জীবনের শেষ ৬-৭ বছর ঘুরে বেরিয়েছেন পাহাড়-জঙ্গল পরিবেষ্টিত ছোটোনাগপুর মালভূমির বিভিন্ন অঞ্চলে। উক্ত বই দুটো ছাড়াও এ সময়ে সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্র, বাণী রায় বা তাঁর স্ত্রীকে লেখা একাধিক চিঠিতে তিনি তাঁর ভ্রাম্যমাণ জীবনের একাধিক অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন। বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম সিংভূম, রাঁচি ও হাজারিবাগ ছিল তাঁর ভ্রমণের প্রধান ভূগোল। এ ছাড়া মানভূমের বাঘমুণ্ডি অঞ্চলেও তাঁর গতায়াত ছিল। পশ্চিম সিংভূমের সারান্ডা ও কোলহানের জঙ্গল, শঙ্খ-কোয়েল-ব্রাহ্মণী নদী অন্যদিকে পূর্ব সিংভূমের ঘাটশিলা, গালুডি, চাকুলিয়া অঞ্চল ভ্রমণকালে একাধিক অখ্যাত নদী, ড্যাম, বুরু বা ডুংরিতে ঘোরার কথা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। সেই সব ছোটো পাহাড়ের উচ্চতা, জঙ্গলের বর্গমাইলের পরিমাপ, উদ্ভিদের শ্রেণী নির্ণয়, শিলারূপের প্রকৃতি সম্পর্কে বহুবিধ তথ্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণীর বিভীষিকা, ছোটো রাজাদের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কথাও বলেছেন ব্যাপ্ত পরিসরে। 

             এ সময়ে তাঁর কিছু ছোটো আখ্যানে চরিত্র বা কাহিনির পরিবর্তে ভূগোল বা সেটিং বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে; তাঁর জীবনদর্শনের কথা ভূগোলকে নির্ভর করেই প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি কোনো কোনো আখ্যানে কোনো চরিত্রই নেই - কেবল প্রকৃতি বা বিশেষ করে বললে ভৌগোলিক নানা পরিবর্তন ঘটনাকে রস সমৃদ্ধ করে তুলেছে। অনেক সমালোচক তাঁর দিনলিপি বা ভ্রমণকথাকে রসাভাস দুষ্ট বলে মনে করলেও এই আখ্যানগুলিকে কমবেশি সকলেই গল্পের মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু এই ধরণের আখ্যানে চেনা ছক পাওয়া যায় না। ভূগোল-নির্ভর বা স্পেসীয় টোম্পোরাল (Spatio Temporal) এই আখ্যানগুলোকে জিও-ক্রিটিসিজমের পদ্ধতিক্রমে আমরা আলোচনা করতে চাই। 

এ ধরণের মোট আটটি গল্পের সন্ধান আমরা পেয়েছি, সেগুলি যথাক্রমে - 

‘অরণ্যে’ (তালনবমী- ১৯৪৪)

‘অরণ্যকাব্য’ (ক্ষণভঙ্গুর- ১৯৪৫)

‘কালচিতি’ (জ্যোতিরিঙ্গন- ১৯৪৯)

‘কুশল পাহাড়ী’, ‘জাল’, ‘মানতালাও’, ‘শিকারী’ (কুশল পাহাড়ী- ১৯৫১)

‘ছোটোনাগপুরের জঙ্গলে’ (রূপ হলুদ- ১৯৫১)

 এর মধ্যে ‘অরণ্যে’র ভূগোল গালুডির কাছে রাখা মাইনসের জঙ্গল; অন্যগুলিও যথাক্রমে - 

‘অরণ্যকাব্য’- বাঘমুণ্ডি শৈলশ্রেণীর মাঠা অঞ্চল

‘কালচিতি’- ডালমা পাহাড়ের কাছে সারোয়া পাহাড়

‘কুশল পাহাড়ী’- মনোহরপুর

‘জাল’- রামগড়

‘মানতালাও’- হাজারিবাগ থেকে গয়া যাওয়ার রাস্তা

‘শিকারী’- শঙ্খনদী-ব্রাহ্মণীর সংযোগক্ষেত্র

‘ছোটোনাগপুরের জঙ্গলে’ - চাইবাসার নিকটবর্তী গৈলকেরা

‘অরণ্যকাব্য’, ‘জাল’ বা ‘মানতালাও’ ব্যতিরেকে বাকি পাঁচটি আখ্যান সিংভূম অঞ্চল নির্ভর। আখ্যানগুলিকে কাহিনির প্রেক্ষিতেও তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন - কাহিনিহীন (অরণ্য, ছোটোনাগপুরের জঙ্গলে), কাহিনির আভাসযুক্ত (কালচিতি, কুশল পাহাড়ী, মানতালাও), কাহিনিধর্মী (অরণ্যকাব্য, জাল, শিকারী)। কাহিনি এখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জনসংস্কৃতিকে তুলে ধরতে চেয়েই বোনা হয়েছে। সেই সংস্কৃতিও ভূগোলনির্ভর। খাদ্যাভ্যাস, পেশা, পোশাক এ সবই জলবায়ু, ভূমিজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে ব্যক্তি চরিত্রের স্বভাব বা মানসিকতাও কতকাংশে নির্দিষ্ট ভূগোলজাত। এই বিষয়গুলিকে ধরতে চাওয়াই আখ্যানগুলির প্রধান লক্ষ্য। সেই সঙ্গে লেখক মনের অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা মিশে গেছে - কখনো রোমাঞ্চ, কখনো ভয়, কখনো মহাজাগতিক জীবনদর্শন। 

           ছোটোনাগপুর খনিজ সম্পদে পূর্ণ অঞ্চল। কোয়ার্টজাইট, নিস শিলার স্তর যেমন আছে তেমনই দামোদর বা সুবর্ণরেখার পলিমাটিও আছে। Physiography-র আলোচনা এই আখ্যানগুলির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সিংভূম অঞ্চল তামা, লোহা ও ম্যাঙ্গানিজ খনিজপূর্ণ। মাইনিং ফার্ম যেখানে বেশি সেখানকার জীবনযাত্রাও ফার্মগুলির দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত। 

আখ্যানগুলিতে অনেক ক্ষেত্রেই বিভূতিভূষণ স্থাননামের হেরফের করেছেন - তা তাঁর এ সময়ে লেখা দিনলিপিগুলি (উৎকর্ণ, হে অরণ্য কথা কও) দেখলেই বোঝা যায়। ফলে মানচিত্রায়নের (mapping) ক্ষেত্রে যথার্থ স্থানটির অনুসন্ধান করা শ্রমসাধ্য। তবুও স্থান (place) নির্ণয়ে কোনো অসুবিধা নেই। আমরা মানচিত্রায়নের দ্বারা অঞ্চলগুলির Physiography, Geology, Mineral Beltsগুলি বোঝানোর চেষ্টা করবো। মৌলিকভাবে লেখক যে Space(পরিসর)-এর কথা বারবার করেছেন তার স্বরূপ নির্ণয় করাই আমাদের মূল কাজ হবে। 

           প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লেখক দিনলিপিগুলি প্রকাশের সময় তারিখ উল্লেখ না করায় কিছু খামতি থেকেই যায়। কেননা দেখা যাবে অনেক আখ্যানের বীজ দিনলিপিগুলিতেই ছড়ানো আছে - সময়কালের উল্লেখ থাকলে ঋতু ধরে মিলিয়ে নেওয়া যেত বিভূতিভূষণের দেখা প্রকৃতির স্বরূপকে। যদিও অনেক আখ্যানেই লেখক ঋতু, এমনকি তিথিরও উল্লেখ করেছেন। 

Downloads

Download data is not yet available.

References

১. চক্রবর্তী, বারিদবরণ, বাংলা কথাসাহিত্যে বিহারের লোকজীবন, জুলাই ১৯৯১, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, পৃ. ১৬৮

২. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলী পঞ্চম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ৩২

৩. ওই, ভূমিকা

৪. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলী সপ্তম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৩৫৬ মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ভূমিকা

৫. PROSAD, AYODHYA, CHOTONAGPUR: Geography of rural settlements, 1973, RANCHI UNIVERSITY, Ranchi p. 13

৬. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলী নবম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ তৃতীয় মুদ্রণ, ১৩৮৫, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ২৫৯

৭. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলী পঞ্চম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ৪৬৭

৮. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলী পঞ্চম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা পৃ. ৪৭৪

৯. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলী নবম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, তৃতীয় মুদ্রণ, ১৩৮৫, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, ভূমিকা

১০. PROSAD, AYODHYA, CHOTONAGPUR: Geography of rural settlements, 1973, RANCHI UNIVERSITY, Ranchi, p. 24

১১. PROSAD, AYODHYA, CHOTONAGPUR: Geography of rural settlements, 1973, RANCHI UNIVERSITY, Ranchi, p. 24-25

১২. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলীএকাদশ খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, চতুর্থ মুদ্রণ, ১৩৯২, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ৩০০

১৩. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলীসপ্তম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, ১৩৬৩, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ৪১৭

১৪. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলীসপ্তম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, ১৩৬৩, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ৪৩০

১৫. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলীচতুর্থ খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, তৃতীয় মুদ্রণ, ১৩৮৫, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, ভূমিকা

১৬. PROSAD, AYODHYA, CHOTONAGPUR: Geography of rural settlements, 1973, RANCHI UNIVERSITY, Ranchi, p. 23

১৭. বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, বিভূতি-রচনাবলী একাদশ খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, চতুর্থ মুদ্রণ, ১৩৯২, মিত্র ও ঘোষ পাব্‌লিশার্স, কলকাতা, পৃ. ৩২১

১৮. PROSAD, AYODHYA, CHOTONAGPUR: Geography of rural settlements, 1973, RANCHI UNIVERSITY, Ranchi, p. 23

Downloads

Published

2023-07-05

Issue

Section

Articles

How to Cite

বিভূতিভূষণের গল্পে ছোটোনাগপুরের ভূগোল : মানচিত্রবোধ ও অভিজ্ঞতার সূত্র . (2023). TRISANGAM INTERNATIONAL REFEREED JOURNAL, 3(3), 166 – 177. https://tirj.org.in/tirj/article/view/963